শরীরটা
কয়েকদিন ভালো যাচ্ছেনা I পেট
নিয়ে ভোগান্তি আরকি
I তাই আজ মসলার আলমারিটা খুলে
নিরামিষ ঝোল বানাবার মশলাগুলো সব আছে
কিনা তাই খোঁজ করছে তুলি
I হঠাৎই চোখ পড়ে একটা কাঁচের বোতলে,
কয়েকটা বড়ি পড়ে আছে
I গত বছর দেশ থেকে মা যখন এসেছিলো তখন নিয়ে এসেছিলো I দেখেই মনটা খারাপ
হয়ে গেলো I কবে যে আবার দেশে যাওয়া হবে এই কোরোনার চক্করে
তাও কিছু বোঝা যাচ্ছেনা I সাবধানে বোতলটা
বার করে ঢাকা খুলে চেক করে
তুলি … নাহ বড়িগুলো এখনো ঠিকই
আছে I মা এনে বলেছিলো “আজকাল তো আর বড়ি দেওয়া হয়না এপার্টমেন্টে এসে, আর দিদুর মতো ওতো ভালো আমি পারিওনা, তবে আমাদের নতুন
পাড়ায় একটা ছোট দোকানে বেশ ভালো বড়ি পাওয়া
যায় I তাই নিয়ে এলুম” I বড়ির বোতলটা হাতে নিয়ে দিদুর বড়ি দেওয়ার কথা মনে পড়ে যায় তুলির I মনটা হুহু করে ওঠে I মনের
হাত ধরে এক লহমায়
সে পেরিয়ে যায় প্রায় চার দশক I
শীতের
ছুটির সকাল তাই ঘুম
থেকে উঠেই মেজোমার তৈরী
গোলাপি সাদা সোয়েটারটা গায়ে চড়িয়েছে
তুলি, মা ই দিয়েছে পরিয়ে
I দুএকটা টুকটাক হোমওয়ার্ক
করে দুধ পাউরুটি খেয়ে তুলি
ভাবছে এবার পুতুলের সরঞ্জাম
বার করবে সে, হটাৎই
দেখে দিদু দোতলা থেকে তিনতলায় উঠে
ছাতের সিঁড়ির দিকে যাচ্ছে হাতে
একটা গামলা আর পেছনে আরো
কিছু সরঞ্জাম নিয়ে মঙ্গলা মাসি
I তাড়াতাড়ি পড়ি মরি সেও গিয়ে দিদুর সঙ্গে ছাতে যাওয়ার বায়না ধরে I মা বলে ওঠে "কোথায় রেলিং ধরে ঝুঁকবে, আবার গা হাতপা ধুলো হবে " I কিন্তু দিদু আছে তার ঢাল I অমনি দিদু বলেন “আর হলেই বা
কি? একটু পরেই তো তুলি স্নান করবে I মঙ্গলা আছে ও দেখবে এখন” ব্যাস তুলি জানে এবার পারমিশন পাকা I মা তো আর দিদুর
ওপর কিছু বলবেনা I ছাতে ওঠার
প্রসেশন এগোতে থাকে I প্রথমে দিদু হাতে গামলা তার ওপর পাতলা ছেঁড়া শাড়ী চাপা, তারপর
মঙ্গলা মাসি হাতে থালা, জালের ট্রে আর ঢাকা আর আরো কিসব জিনিস আর সব শেষে আট
বছরের তুলি হাতে ঠাকুমার ঝুলি বই I যদি দিদুকে
বুঝিয়ে একটা অন্তত গল্প ছাতে বসে শোনা যায় তাই আরকি I
মঙ্গলা
মাসির হাতে ওই জালের ট্রে আর জালের
ঢাকা দেখেই তুলি বুজেছে
দিদু আজ বড়ি দেবে
I গত বছর ও একবার
দেখে ছিল কিন্তু ভালো
মনে নেই I ওরা সেদিন কোথায়
যেন একটা বেড়াতে
যাচ্ছিলো তাই আর ছাতে
দিদুর সঙ্গে বসে ভালো করে দেখা হয়নি
I এবার খুব মন দিয়ে
দেখে শিখে
নেবে সে
I তুলিদের শ্যামবাজারের বাড়ির বিশাল ছাত, তারই দক্ষিণ কোনের দিকটা বেশ ভালো করে আগেই
পরিষ্কার করে গেছে মঙ্গলা মাসি I সেখানেই সব সরঞ্জাম নিয়ে
শতরঞ্চি পেতে বসে তিনজনে
I
শীতের
রোদ্দুর পিঠে লাগিয়ে দিদু
গামলায় সাদা একটা গোলা
ফেটাতে থাকেন আর তুলির অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকেন I মঙ্গলা
মাসি বড় বড় পরিষ্কার
ডালার ওপর জালের ট্রে
পাতছে I তুলি জেনেছে ওই
সাদা গোলাটা নাকি ডাল বাটা
আর ওটা দিয়েই দিদু
বড়িদের পুরো পরিবার
বানাবে I জালের ট্রে পাতা হলে শুরু
হয় বড়ি দেওয়া I হিঙের গন্ধে ভুরভুরে ডালবাটা থেকে গোল গোল ছোট নাড়ুর মতো পাকিয়ে দেওয়া
হতে থাকে বড়ি I আগামী দুতিন দিন দিদুর
নরম ফর্সা হাত থেকে এই ডালবাটা আর হিঙের গন্ধ পাওয়া যাবে ঘুমোনোর সময় I নাড়ুর গোল্লাটা জালের ট্রে তে বসিয়ে তার মাথাটা উঁচু করে সরু করে দিচ্ছেন
দিদু I সঙ্গে চলছে তুলির প্রশ্নবান
… "বড়ি পরিবারে কে কে আছে
দিদু? ওরা কে কি করে ?" দিদু গল্প বলছেন
… "বড়ি দাদু আছে, বড়ি দিদা আছে" বলেই বড়বড়
বড়ি দুটোকে দেখান I তারপর আছে মা, বাবা, মামু,
মামী, কাকু , কাকিমনি , জেঠু, জেঠিমারা আর তারপর তাদের কচি কাঁচার দল
…এমন ভাবেই চলে বড়ি দেওয়া আর গল্প I পরিবার সম্পূর্ণ করতে নানা সাইজের
বড়ি দিতে থাকেন দিদু,
ভরে ওঠে জালের ট্রে I হঠাৎই এক মোক্ষম প্রশ্ন
করে তুলি, “আচ্ছা দিদু, বড়িদাদু আর বড়িদিদা একই রকম দেখতে কেন
? বড়িদিদা কেন তোমার মতো
সিঁদুর দিয়ে টিপ্ পরেনি আর বড়িদাদু র কেন দাদুর মতো কাঁচাপাকা গোঁফ
নেই ?” “ঠিক তো তাও তো বটে ” বলেন
দিদু I এমন সময় হঠাৎ নিচ থেকে
মার গলা, তুলির স্নানের সময় হলো সে যেন নিচে নেমে
আসে I তুলি খুব বিরক্ত ঠিক গল্পের মাঝখানে মা ডেকেছে I যাবেনা বলছে সে কিন্তু শেষে দিদুর কোথায়
রাজি হয় I দিদু বলেছে বড়িদিদা আর বড়ি দাদুকে সাজিয়ে দেবে যদি তুলি ঠিকঠিক লক্ষী
হয়ে স্নান করে খেয়ে নেয় I
এরপর
স্নান, খাওয়া আর ঘুম I বিকেলে উঠে হঠাৎই মনে
পড়লো বড়িদাদু আর বড়িদিদার কথা I তাড়াতাড়ি ছুটে
গিয়ে দিদুকে না পেয়ে মঙ্গলা মাসিকেই জিগেশ করে তুলি “দিদু যে বলেছিলো বড়িদিদা আর বড়িদাদুকে
সাজিয়ে দেবে ?” মঙ্গল মাসি হেসে ফেলে, বলে
“চলো ছাতের ঘরে দেখবে এখন তো ওখানেই তোলা হয়েছে” I দুজনে আবার ওঠে ছাতের ঘরে ... ওমা তাইতো
n বড়িদিদার মাথায় একটা ছোট সিঁদুরটান আর বড়িদাদুর
কালো এক চিলতে গোঁফ কাঠি দিয়ে বসানো I দিব্বি সেজেগুজে পরিবারের মাঝখানে বসে আছে দুজনে I দিদু কথা রেখেছেন, বড়িদাদু
আর বড়িদিদাকে সাজিয়ে দিয়েছেন তুলির কথা মতো I তাদের চিনতে একটুও অসুবিধে হচ্ছেনা মোটেই
I দিদু বরাবরই কথা রাখেন I
“মাম্মা
খিদে পেয়েছে” শব্দে চটকা ভাঙে তুলির I দেখে সামনে দাঁড়িয়ে
ছেলে অয়ন I ও যে কখন কিচেনে এসেছে খেয়ালই করেনি তুলি I অয়ন আবার জিগেশ করে "মাম্মা
কি ভাবছিলে?" তাড়াতাড়ি তুলি একটু লজ্জা পেয়ে বলে ওঠে "নানা কিছুনা
এই তো কি খাবার বানাবো তাই আরকি " I এক
মুহূর্তে মিলিয়ে যায় দিদু আর বড়িদিদা দুজনেই I শুধু থেকে যায় সেই
নরম হাথের স্পর্শের রেষ আর ডালবাটা আর হিঙের গন্ধের সুখস্মৃতি I তুলি এবার ঠিক ইউটুবে দেখে বড়ি দেওয়াটা শিখে নেবে I