Tuesday, 1 March 2016

চচ্চড়ির ইতিকথা

সেদিন Willy আলুর পিউরে বানাচ্ছিল রাতে ডিনারে স্টেকের সাথে সার্ভ করবে  বলে অতিথীর সংখ্যা মন্দ না তাই অনেক আলুর খোলা জমা হয়েছিল Willy অভ্যাসবশত তা আবর্জনা ফেলতে যাচ্ছিল,  আর এমন সময় হঠাৎই আমার চোখে পড়ে গেল ছোটবেলার অনেক গুলো পুরোন কথা মনে এলো আর হল্যান্ডের মেঘলা দিনে এক ঝলক সোনালী রোদের মত ভরিয়ে দিল মনটা কি মনে হল, বললাম ওগুলো ফেল না ওতো অবাক, ব্যাপার কি? কি হবে আলুর খোলা দিয়ে? বলে বসলাম হবে একটা জিনিষ হলে খেয়ে দেখে বোলো শুনে খুব খুশী, সব ভারতীয় ব্যাপারেই ওর উৎসাহের শেষ নেই তার ওপর খাবার হলে তো কথাই নেই  

আসলে ছোটবেলায় আমাদের ঠাম্মা (বাবাদের কাকীমা) ওই বাড়তি আলুর খোলা দিয়ে অসাধারণ একটা চচ্চড়ি করতেন তার স্বাদ আর গন্ধ ছিল  একবারে আলাদা রবিবার সকালে লুচির সঙ্গে পাওয়া যেত সে অনেক পুরোন কথা ঠাম্মা নিজের হাতে খাইয়ে দিতেন তখন কারণ আমি যে দাদুর কাছে গল্প শুনতে ব্যস্ত আর না হলে জানালার ধারে বা বারান্দায় দাড়িয়ে শ্যামবাজার ট্রাম ডিপোর ট্রাম গুনছি, কটা ট্রাম ঢুকলো কটা বেরোল তার হিসেব ভাব খানা আমি যেন ডিপোর কর্ণধার, হিসেব না রাখলে কলকাতার ট্রাম কম্পানির ব্যবসা লাটে উঠবে আর বারান্দা বলতে মনে পড়ল এই বারান্দা থেকে কতবার আমরা পরেশনাথের মিছিল দেখেছি তখন অবশ্য বারান্দা ভর্তি লোক, আমার মা, কাকিমণি, মনীমারা, জ্যাঠামশাইরা আর দাদা দিদিরা, যারা সময় পাশ্চাতের প্রভাবে আজকাল কাজিন বা রিলেশন হয়ে উঠেছে তখন তারা ছিল অনেক বেশী আপনার হয়ত এখনো দুএকজন তাই রয়ে গেছে, ভাগ্য ভাল নাহলে যে সব যোগসূত্রই হারিয়ে যেত যাই হোক পরেশনাথের মিছিল একসঙ্গে দেখার আনন্দ আর তারপর আলুর খোলা নয় বরং ঠাম্মার হাতের তৈরী অন্যান্য  উপাদেয় খাবার খাওয়ার মজাই ছিল আলাদা তোমরা যারা বিডন স্ট্রিট থেকে বাগবাজার এর মধ্যে হয়েছ তারা অনেকেই সহজেই সেই আয়না গাড়ি, বই গাড়ি, সোনার মন্দির এর  স্মৃতিচারণ করতে পারবে    
 
যাই হোক ফিরে যাই সেই চচ্চড়ি গল্পে পরেও খেয়েছি জিনিষটা আবার তখন অবশ্য আমি মধ্যস্কুলে ঠাম্মা তখন চলে গিয়েছেন ঘাটশীলা প্রতি বছর শীতের ছুটিতে দু তিন সপ্তাহ তো যাওয়াই হত ঘাটশীলা তখন খেয়েছি এই আলুর খোলার চচ্চড়ি তবে লুচি নয় বরং গরম গরম আঠার রুটি দিয়ে রুটি বলতে মনে পড়ে গ্যাসের ব্যবস্থা ছিল না ওখানে স্টোভ ছিল বটে একটা কিন্ত বেশীর ভাগ রান্না হত কাঠের জালের উনুনে বাড়ি কাজের লোক ব্রম্হা প্রসাদ মান্না বয়স আশির কাছাকাছি কিন্ত পরিশ্রমি চল্লিশের মত, তেমনি বহু দিনের পুরানের আর বিশ্বাসী আমি বলতাম ব্রম্হা দাদা আমার বাবাকে ডাকত নাম ধরে আর নাহলে খোকনবাবু বলে আমার হাসি পেত খুব ব্রম্হা দাদা এলেই উনুন ধরত, জলখাবার হত, গরম রুটি আর তরকারি না হয় চচ্চড়ি
আর  না হয় ডিম , পাঁউরুটি ঠাম্মার রান্না ছিল শিল্প কম তেল মশলাতেও যে এত সুন্দর স্বাদ আর গন্ধ হতে পারে খাবারের, না খেলে তা জানা যায় না বেশীর ভাগ দিন জলখাবারের থালা হাতে বাবার সঙ্গে ছাতে চলে যেতাম ঠান্ডায় ছাতে পাতা চৌকিতে রোদে গরম হওয়া বালাপোষ মুড়িয়ে গরম রুটি আর চচ্চড়ি  খাচ্ছি আর গল্প শুনছি বাবার কাছে বাবাদের ছোটবেলার গল্প বাবা, কাকামনি আর   ব্রম্হা দাদার বড় ছেলে ঘাসী দুপুরের গরমে ঠাঠা রোদে কোন গাছের মগডালে উঠে বসত, ভাটাইঝুড়িতে নেমে আর সুবর্ণরেখার তীরে কি করত বলতে বলতে বাবার দৃষ্টি দূরে কোথায় হারিয়ে গেছে  I মন খারাপ করা ভাল লাগা গল্প, কাকামনি আর ঘাসী দুজনেই যে ছায়া এখন শুনতে শুনতে কোথায় তলিয়ে গেছি, হঠাৎ চটক ভাঙে দূরে ট্রেনের হুইসেলে আরে তাইতো সাড়ে দশটা বাজে কলকাতা থেকে ইস্পাত এক্সপ্রেস ঢুকবে এবার কিন্ত ঢোকার আগে পেরোতে হবে ভাটাইঝুড়ি  ওপরের ব্রিজটা আর ঠাম্মার বাড়ি ছাত বা রক থেকে ছোট পাহাড়ি গুলো পেরিয়ে সোজা এই ব্রিজটা দেখা যেত, আর দেখা যেত ট্রেনগুলো I আরো দেখা যেত পাহাড়ি লাল মাটির পথ ধরে ঝুড়ি বা হাঁড়ি মাথায় শাঁওতালী মেয়ের দল I  ততখনে হয় নিচ্ থেকে মার গলা, স্নান করার তলব আর না হলে ঠাম্মার ডিম সেদ্ধ হাতে ওপরে ওঠা I দিশী মুরগী ডিম কলকাতার শহরের ভি ভেজালে অমিল তাই পনেরো দিন ধরে নাতনীকে সেটা খাইয়ে আগামী   আট মাসের রসদ জোগান পয়এিশ বছর পর আজ ঠাম্মা কলকাতার অবস্থা দেখলে কি মত যে দিতেন জানিনা ঠাম্মা কাছাকাছি এলে জানান পাওয়া যেত কারণ অদ্ভুত একটা ক্যান্থারাইডিন তেল, তুহীনা আর জর্দা মিশেল গন্ধ সে গন্ধের উৎ্সগুলো হারিয়ে গেলেও তার সঙ্গে জড়ানো স্মৃতি আর সুন্দর অনুভূতি গুলো এখন উজ্বল  এবার নিচে নেমে স্নান সারার পালা নামার সময় পিছন দিকের বাগান পেরিয়ে আর গমের খেত ছাড়িয়ে দূরে দেখা যেত চিকচিক করছে সুবর্ণরেখা নদীর বালি জল বাবা, মাকে বলতেন দেখ মনে হয় যেন তরুণ মজুমদারের ছবির সিন তখন বুঝিনি কিন্ত পরে হয় ওঁর সিনেমা দেখে বাবার কথার অর্থ বুঝেছি যাই হোক নিচে নামতে নামতে ভাবি সন্ধ্যে বেলা আবার ট্রেন দেখব, তখন স্টীল এক্সপ্রেস যাবে উল্টো দিকে টাটানগর থেকে কলকাতা   সন্ধ্যের অন্ধকার আর হাল্কা কুয়াশার মধ্যে দিয়ে যেন এক ঝলক হীরের নেকলেস্  

হঠাৎ Steven এর গলা শুনে ফিরে এলাম আমাদের হল্যান্ডের বাড়ি রান্না ঘরে এক লহমায় পেরিয়ে এলাম পয়এিশটা বছর I জিঙ্গেশ করছে কি ভাবছি কি বলব? ভাবছি গন্ধ আর অনুভূতি এই দুটো স্মৃতিকে
বন্দি  করার যন্ত্র এখনো আবিস্কৃত হয়নি ভাগ্যিশ, তাই তাকে পুনর্নির্মাণ করতে মানুষের প্রয়োজন এখনো চট করে ঠিক করলাম করেই ফেলি পয়এিশ বছরের পুরোন সেই চচ্চড়ি উনুন নেই তবু ইন্ডাকশন স্টোভে বসালাম পাত্র ভাগ্য ভালো সর্ষের তেল ছিল রাড়িতে না হলে ওলিভ্ ওয়েল দিয়ে চালাতে হত,  আর সেটা মোটেই ভালো হত না ফোড় দিতে গিয়ে হলো বিপদ পাঁচ ফোড় তো নেই তবু সর্ষে, কালো জিরে, মেথী আর মৌরি মিশিয়ে ফোড় দিয়ে ভাজতে বসিয়ে দিলাম ভালো করে ধোয়া আলুর খোলাগুলো ভাজতে ভাজতে এক চা চামচ হলুদ গুঁড়ো আর হাফ্ চা চামচ লাল লঙ্কার গুঁড়ো মিশিয়ে দিলাম চচ্চড়িতে আর আন্দাজ মত একটু রসুন বাটা আর লবন একটা কাঁচা লঙ্কা চিরে দিলাম তারপর প্রথম পাঁচ সাত মিনিট পুরো আঁচে ভেজে তারপর আঁচ কমিয়ে আরো দশ মিনিট বেশ মুচমুচে হতে স্টোভ নিবিয়ে দিলাম গরম রুটির বাহুল্যতা ডাচ্ রান্না ঘরে আশা করা উচিত না তাই ফ্রোজেন পরোটা ভাল করে তাওয়ায় গরম করে চচ্চড়ি সঙ্গে বেশ ভালোই লাগছিল ঠাম্মার মত হয়নি ঠিকই তবুও তো ছোটবেলার সরল সেই স্বাদে ভরা I কোনো তিন তারা মিশেলাঁ রেস্তরাঁয় পয়সা দিলেও পাবেনা Steven এর খুব ভালো লেগেছিল  

যখন এই লেখাটা লিখছি তখন আমি ঠালীস ট্রেনে আমস্টারডাম থেকে প্যারিসের পথে ভোর সাতটা, বাইরে তখন মাইনাস দুই ট্রেনের উষ্ণতা উপাভোগ্ করতে করতে ভাবছি কি লিখি হঠাৎ মিষ্ট গলায় ফরাসিতে কেউ আমায় সুপ্রভাত জানায় মুখ তুলে দেখি তরুণী এক ট্রেন সেবীকা জানতে চায় আজ জলখাবারে আমি ননতা চাই না মিষ্টি বাকি কথোপকথন ফরাসিতেই সারা বলল জানে আমি কফিতে দুধ চিনি মেশাই না অবাক হলাম I বলল নাকি আমাকে আগে দেখেছে বললাম হতেই পারে,  আমি তো লাইনের পুরোন পাপী, সাপ্তাহিকী বলতে পার এক ট্রে ভর্তি খাবার দিয়ে গেল রকমারি চিজ্, হ্যাম, পাঁউরুটি ইত্যাদি কোনোটা তেই উষ্ণতার কোনো লেশ মাত্র নেই, কফি ছাড়া মনে পড়ে গেল একটা বিখ্যাত
বিজ্ঞাপন.... জীবনের নানা ওঠা পরা যেন সহজে গায় না লাগে তবু ছোটবেলার ফেলে আসা সেই গরম রুটি, চচচ্চড়ি আর ভালবাসার এক কণা মাত্রকে আঁকড়ে ধরতেই লিখতে শুরু করলাম এটা

No comments:

Post a Comment