বাবাই
আজ বহু দিন পর হাতে চিঠি লিখছি
। তোমাকে চিঠি লিখতে খুব ইচ্ছে করলো সেদিনের
একটা ঘটনা নিয়ে । জানি এ চিঠি তুমি পড়তে পারবে না তবুও না লিখে পারছিনা কারণ জানি পড়লে
তোমার খুব ভালো লাগত ।
গরমের ছুটি
আসছে তাই Steven আজকাল প্রায়ই ছুটিতে বেড়াতে যাবার প্লান নিয়ে তাগাদা লাগাচ্ছে । আমাদের
এদিকে মানে পাশ্চাত্যের দেশগুলোয়, গরম কালের বিশেষ কদর । কেবল এই চার পাঁচটা মাস ওভার
কোট, বুট, দস্তানা আর হিটিং এর হাত থেকে নিষ্কৃতি । তার ওপর শীতকালে এই হল্যান্ড দেশের
হীমেল হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টি মোটেই সুখকর অভিজ্ঞতা নয় আর তাই জন্যই এদের গৃষ্ম
প্রীতি । আমার প্রথম প্রথম খুব অবাক লাগত জানো,
ভারত তথা কলকাতার গরমে ভুক্তভুগি মানুষের যেমন হওয়া উচিত । এখন খানিকটা অভ্যেস হয়ে গেছে । তা যাই হোক কদিন আগে
কর্তার এমনি এক তাগাদা খেয়ে এক রবিবার দুপুরে নেট সার্ফিং আর কেদারা আলুর বাহুল্যতা
শিকেয় তুলে বেড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে বসেছি । ভাবলাম বইয়ের আলমারি থেকে Travel Guide টাও হাতের কাছে রাখি তাতে বার বার ল্যাপটপে এক সজ্ঞে অনেকগুলো window খুলতে
হয় না । Travel
Guide টা বার করতে গিয়ে বেরিয়ে পড়ল একটা পুরনো
প্রিয় বই । মলাট উল্টে দেখি তোমার হাতের সেই বিখ্যাত সবুজ কালীতে লেখা আমার নাম আর তোমার সই । মনটা হুহু করে এক মুহূর্তে পেরিয়ে
গেল পয়ত্রিশটা বছর আগের আরেক রবিবার দুপুরে । মনের চেয়ে শক্তিশালী time machine বোধয়
আর আবিষ্কার হয়নি, হবেও না ।
তোমার মনে আছে আমাদের স্কুল আমলে গৃষ্মের ছুটি ছিল কেবলই ছুটি , তাতে summer camp এর বস্ততা ছিল না, ছিল না হুড়মুড়িয়ে একটা নতুন কিছু শিখে ফেলে বাবা মাদের ego চরিতার্থ করার চাপ ? কিছু অঙ্ক, ইংরেজি বা হাতের লেখার homework ছাড়া বাকি সময়টা ছিল নিজের আর নিজের পছন্দ মত ছেলেবেলা কাটানোর । তাই কলকাতার গরম সত্তেও গরমের ছুটি ছিল আমার বেশ প্রিয় । অবশ্য এর আরেকটাও কারণ যে ওই সময় পড়ত আমার জন্মদিন আর তার মানে উপহার, বিশেষ করে নতুন বই । তুমি এনে দিতে কলেজ স্ট্রিট না হলে অক্সফোর্ড বুক হাউস থেকে । এমনি এক জন্মদিনে তোমার দেওয়া উপরক্ত ওই বইটি ।
মনে আছে আমাদের
শ্যামবাজারের বাড়িতে সেই বই বোঝাই বুক্ কেস
টা ? যার কাঁচের স্লাইডিং ডোরটা খুললেই বই আর কাঠ মিলিয়ে অদ্ভুত সুন্দর একটা গন্ধ পাওয়া
যেত । পরে মা ওটা বাতিল করে নতুন বুক্ কেস তৈরী করিয়েছিল । আমার খুব মন খারাপ হয়েছিল
জানো? সেই সুন্দর গন্ধটা কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল । আমাদের শোয়ার ঘরটা কি অসহ্য গরম
হত মনে পড়ে ? তিন তলায় দক্ষীণ পশ্চিমের ঘরতো । তাই দুপুরে খাওয়ার পর মা মেঝে মোছানোর ব্যবস্থা
করত আর তুমি কি রাগ করতে মাটিতে শোয়া নিয়ে । আধ শুকনো হলে পাতা হত শীতলপাটি । শীতলপাটির
চারদিক মোড়া থাকত দিদুর পুরনো শাড়ির পাড় দিয়ে, তাতে গায়ে খোঁচা লাগত না আর শীতলপাটিটা দেখাত ভারি সুদৃশ । যারা ছোটবেলায় শীতলপাটি ব্যবহার করেছে তারাই জানে এর মজা । আর হাল
আমলের লোকেদের বলি এটা মাদুর বা ম্যাট নয়, সুযোগ পেলে ব্যবহার করে মজা উপভোগ করতে পারে
। যাই হোক ফিরে যাই ছোটবেলার সেই দুপুরে । মা তো সব জানলা বন্ধ করে ঘর অন্ধকার করে
দিত যাতে মেয়ে ঘন্টা
দুয়েক ঘুমাতে পারে কিন্তু মেয়ের মন তখন বইয়ের পাতায় । তাই যেই মা ওপাশ ফিরে ঘুমিয়েছে অমনি আমি নিচের
একটা খড়খড়ি ফাঁক করে বই এর পাতায় আটকে গেছি ।
এমনি এক গৃষ্মের
দুপুরে তুমি ওদিকের ঘরে আর আমি আর মা শোয়ার ঘরে শীতলপাটিতে । যেই না মা ঘুমিয়েছে
অমনি জন্মদিনে তোমার দেওয়া ওই নতুন বইটি মলাট
উল্টে গন্ধ শুঁকে পড়তে শুরু করি । দুপুর বিকেল একটানা পড়ে শেষ করেছিলাম জন্মদিনে পাওয়া এই বইটির গল্পগুলো । প্রতিটা
গল্পের শেষে চমক গুলো ছিল উপরি, যা আজও পুরনো হয়নি । ভাগ্যিস্ আমাদের ছোটবেলায় স্মার্টনেস
কেবল ব্যক্তিত্ব আর ট্যাবলেট শুধু ওষুধের মধ্যে সিমিত ছিল তাই পুরনো এই সব উপহারগুলো
আজ ও অমূল্য রয়ে গেছে, প্রযুক্তির অগ্রগতির ধাক্কায় হারিয়ে যেতে
বসেনি !
বইটির সঙ্গে
আরো একটা স্মৃতি জড়িয়ে আছে, তার চিন্হ শেষের একটা পাতায় পেয়ে গেলাম । মনে আছে আমার
ছোটবেলায় গৃষ্মের বিকেলে প্রায়দিনই আম পোড়ার সরবত করত মা । এটা খেতেই হত না হলে মা
ছাড়ত না, এমন কি তোমাকেও । খেলে নাকি পেট ঠান্ডা থাকবে । তর্ক করার সাহস ছিল না মোটেই
তাই পাঁচন গেলার মত চটপট খেয়ে নিতাম এক চুমুকে । সময় ও অবস্থার সঙ্গে সঙ্গে সেই সরবত আজকাল উধাও হয়েছে জানো, আর বেড়েছে তার কদর ও আকর্ষণ ।
তাই কিছুদিন আগে কলকাতার এক নামীদামী রেঁস্তোরায় পয়সা খরচা করে খেয়ে ফেললাম এটা ।
যাইহোক ছোটবেলার
সেই রবিবারটাতেও মা আম পোড়ার সরবত করেছিল। আমি নতুন বইয়ে ডুবে তাই তাড়াতাড়ি সরবতটা
শেষ করে বইয়ে ফেরত যাব, হঠাৎ হাত চলকে একটু পড়ে যায় শেষের দিকের একটা পাতায় । তোমরা
দুজনেই খুব বকে ছিলে সেদিন, জিনিষে যত্নের অভাব নিয়ে । কিন্তু তার চেয়ে ও অনেক বেশী তিরস্কৃত করেছিলাম নিজেই নিজেকে, নতুন
বইয়ের গন্ধটা গেল নষ্ট
হয়ে । অবশ্য এতদিন পর সেই আম পোড়ার সরবতের
মলিন হয়ে যাওয়া খয়েরী দাগটা মহামূল্য মনে হচ্ছিল । দাগটায় হাত বুলিয়ে যেন ছোটবেলার
হারিয়ে যাওয়া এক রবিবারের স্মৃতিকনা আঁকড়ে ধরতে চাইছিলাম ।
Steven এর
ডাকে চট্কা ভাঙে । ও জানতে চাইছে Travel Guide টা পেলাম কিনা । তোমার হাতের লেখাটায়
আরেকবার হাত বুলিয়ে বন্ধ করলাম বইটা । এ অটোগ্রাফ ও আমার কাছে বড় মূল্যবান, তুমি যে
আজকাল আর কিছুই লেখ না বাবাই । বই বন্ধ করেতেই আবার চোখ পড়ল মলাটের ওপর, সময়ের ছাপ
মলাটের ওপর অল্প বিস্তর পড়লেও হাল্কা প্রিন্টের ওপর ঝকঝকে সবুজ ও বেগুনী ওরফে
"এবারও বারো" এখন ও উজ্বল আর তেমনি উজ্বল লেখকের নামটা । অবশ্য সেটা শুধু মলাটেই না আমাদের মনের
মধ্যেও ।এবার এপ্রিল মাসে দেশে যাচ্ছি তাই ইচ্ছে আছে আমন, রধারানীদের আম পোড়ার সরবত করে খাওয়াবার । ছোটবেলায় মা যেমন করতো । মনে আছে কাঁচা আম লম্বা করে শরু শরু কেটে নুন মাখিয়ে দুতিন দিন কড়া রোদে শুকিয়ে পরিষ্কার কাঁচের জারে টাইট করে বন্ধ রাখতো । আম পোড়ার সরবতের জন্য কয়েক পিস্ নিয়ে শুকনো তাওয়ায় শেকে নিত মা আর তারপর ঘন্টা চার পাঁচ ভিজিয়ে রাখ ঠান্ডা জলে । কয়েক ঘন্টা ভেজার পর এটাকে পাল্প বানিয়ে ছাঁকনিতে ছেঁকে গ্লাসে ঢালত । আন্দাজ মতো চিনি আর একটু বিটনুন মিশিয়ে খেতাম আমরা । মাঝে মাঝে মা একটু ভাজা মশলার গুঁড়ো মিশিয়ে আর তারপর ফ্রীজে রেখে ঠান্ডা করে সার্ভ করত । তখন অবশ্য বেশি ভালো লাগত । মা বলল এখন আর করে না তোমার খেতে অসুবিধা হয় বলে ।
তুমি ভালো থেকো । আশাকরি এপ্রিলে দেখা হবে, এবার শেষ করি ।
প্রনাম জেনো
ইতি
Bah! aam porar sorboter mato e tok misti lekha...
ReplyDelete