মা
আজ ৮ই মে আমাদের সাহেবি মতে Mother's Day অর্থাৎ মাতৃ দিবস । হল্যান্ডে গত এক মাস ধরে চলছে দোকানে বাজারে মাতৃ দিবসের তোড়জোড় । এমনকি গত সপ্তাহে আমাদের ব্যাঙ্গালোরে ও হাল আমলের এই উৎসবের আমেজ দেখে এলাম । ভাবতে অবাক লাগছিল মাকে বা সন্তানদের ভালোবাসা জানাবার বা জিনিষ দেওয়ার জন্য বছরের একটি বিশেষ দিনের কি প্রয়োজন । আমি তো তোমাকে বা আমন রাধারানীকে রোজই ফোন করি । বরং আজই একটু কম কথা হলো তাড়া থাকার জন্য । যাই হোক আজ একটা বিশেষ কারণে তোমাকে চিঠি লিখতে খুব ইচ্ছে হলো তাই লিখছি ।
জান মা, আজ সকালে ফেসবুক খুলে অবাক হয়ে গেলাম । আমার বহু বাঙালি বন্ধুরা তাদের মা অথবা সন্তানদের মাতৃ দিবসের শুভকামনা জানিয়েছে । কিন্তু বিশ্বকবির জন্মদিন মনে রাখেনি শতকরা নব্বই ভাগ লোক । আমাদের ছোটবেলায় ৮ই মের তাৎপর্য ছিল ২৫ শে বৈশাখ কবিগুরুর জন্মদিন । যুগের হাওয়া আর পাশ্চাত্যের প্রভাবে দুঃখের বিষয় তা হারাতে নাহোক বিশেষ কমতে শুরু করেছে । আমাদের ছোটবেলায় এইদিনটি শুরু হত রবিন্দ্র সংগিত দিয়ে আর তারপর রেডিও বা টিভিতে সারাদিন রবি ঠাকুরকে নিয়ে হত বিভিন্ন অনুষ্ঠান । ছুটি না থাকলেও থাকত একটা উৎসবের আমেজ । পরে বড়ো হয়ে অনেক রবিন্দ্র জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে নিজে ও অংশ নিয়েছি । কিন্তু এখন এই সব সুন্দর উৎসব গুলো কোথায় যেন হারাতে বসেছে । শুনেছি কলকাতায় আজকাল নাকি ভোট প্রচারেও রবিন্দ্র সংগীত বাজানো হয় !!!!
মা, তোমার মনে পড়ে আমার প্রথম রবিন্দ্র জয়ন্তী ? তখন বয়স প্রায় আট ছুঁই ছুঁই ক্লাস থ্রি তে পড়ছি । ক্লাস টুয়ের বাচ্ছা নয় আর একেবারে ক্লাস থ্রি জুনিয়র স্কুল তাই বড় বড় ভাব । আমাদের স্কুলের একটা দারুন গুন ছিল ইংরেজি মাধ্যম বা মিশনারি স্কুল হলেও বাংলা সংস্কৃতির চর্চা ছিল পুরদস্তুর । আজ সেই শিক্ষার গুনেই বাংলা ভাষাকে এতো ভালবাসতে শিখেছি আর শিখেছি তোমার জন্য কবিগুরুকে ভালবাসতে ।
যাই হোক ফিরে যাই সেই প্রথম রবিন্দ্র জয়ন্তী অনুষ্ঠানে । স্কুল ঠিক করল রবিন্দ্র জয়ন্তী হবে । বেশ কয়েকটা নাচ ও গানের অনুষ্ঠান মিলিয়ে জুনিয়র ও সিনিয়র স্কুল একত্রে হয়ে বেশ একটা জমাটি ব্যপার । দুদিন ধরে অনুষ্ঠান হবে যাতে জুনিয়র ও সিনিয়র স্কুলের সব ছাত্রীরা ঠিক করে অনুষ্ঠান দেখতে পারে । আমাকে নেওয়া হয়েছিল জুনিয়র গ্রুপের একটি নাচে, রবি ঠাকুরের
"আমরা সবাই রাজা"
গানটার সাথে । আমাদের পি টি টিচার নাচ শেখাবেন আর গান করবেন সিনিয়র স্কুলের কিছু ছাত্রী আর কয়েক জন টিচার । রিহার্সাল শুরু হল কয়েকদিন পর থেকে । নাচের স্কুলের বাইরে সেই প্রথম নাচ । ভয় আর উত্তেজনা দুই ছিল মনের মধ্যে, কিন্তু নাচ শেখার আগ্রহ ছিল খুব কারণ জীবনে প্রথম রবিন্দ্র জয়ন্তী পালন করা হবে । আসতে আসতে আয়ত্তে এলো নাচ । আমাদের আমলে টিচারদের ধৈর্য ও ভালবাসা দুই ছিল অশেষ । মুদ্রাগুলো আয়ত্ত করিয়েই ছাড়েন পি টি মিস্ । পোশাক ঠিক হলো বাসন্তী রং এর পাজ্ঞাবি আর সাদা চুড়িদার । ওই সময় চুড়িদার ব্যাপারটার চল হয়নি বিশেষ । যেটা ছিল সেটা চুড়িদারের মত টাইট কিন্তু চুড়ি নেই । চোস্ত পায়জামা বলা হত । তাই সাদা চোস্ত ঠিক হল। আর কোমরে বাটিকের স্কার্ফ। মনে আছে তুমি শ্যামবাজারের পাজ্ঞাবি স্টোর্স থেকে কিনে দিয়েছিলে ছেলেদের পাজ্ঞাবি । কিংবদন্তির নাম জানা হয়নি তখনো ।
সেই পোষাকে আমাদের বেশ মানিয়েছিল রবিন্দ্র জয়ন্তীর নাচে । কিন্তু সবচেয়ে বড় উত্তেজনা মেক-আপ । জীবনের দ্বিতীয় বার মেক-আপ এবং এবার সত্যি মেক-আপ দিয়ে তাই উত্তেজনার শেষ নেই । অনেক রিহার্সাল দিয়ে শেষ পর্যন্ত সেই বহু অপেক্ষিত দিন হাজির । জুনিয়র স্কুলের জন্য অনুষ্ঠান । সকাল থেকে স্কুলে এসে স্কুলের পোষাক বদলে পাজ্ঞাবি চোস্ত পরা হয়েছে । কয়েকজন টিচার মিলে মেক-আপ দিলেন সকলকে । জীবনে প্রথম আসল মেক-আপের রূপ, রস, বর্ণে নিজেদের হুরি পরী সুন্দরী মনে হতে লাগল । যেন ঠাকুরমার ঝুলি থেকে উঠে আসা সোনার কাঠি ছোয়ান রাজকন্যা একএকটি । স্টেজের কোনায় রবি ঠাকুরের ছবি সাজানো তাতে রজনিগন্ধার মালা । সব নাচের গ্রুপকেই ছবিতে প্রণাম করে তবে নাচ শুরু করতে হবে । আমরা ও তাই করলাম । দশটি অষ্ট বর্ষিয়া, চোখে ভয়মাখানো স্বপ্ন । তারা সবাই রাজা না হলে ও রাজকন্যা তো বটেই, নিজেদের কাছে, মা বাবারদের কাছেও ।
আমাদের নাচ শেষ এবার অন্যদের বাকি অনুষ্ঠান দেখার পালা । তার চেয়ে ও বড় কথা কাল সিনিয়র স্কুলের বড়মেয়েরা আর সিনিয়র টিচাররা আমাদের নাচ দেখবেন । উত্তেজনার চুড়ান্ত । মনে আছে বাড়ি ফিরে তোমাকে, দিদুকে, বাবাই কে সব গল্প করতেই কেটে গেল বাকি দিনটা । রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়া কারণ পরের দিন আরো বড় অনুষ্ঠান । নাচের স্বপ্নে রাত কাবার । কখন যে ভোর হয়ে গিয়েছিল তা বুঝতেই পারিনি । মনে আছে তোমার ডাকে ঘুম ভাঙে । তোমার ঠান্ডা হাতের স্পর্শ কপালে, আর তারপর একটা হই চই । মনে আছে আমার অনেক অনুনয় সত্তে ও স্কুল যেতে দেওয়া হল না আমাকে। হল না সিনিয়র স্কুলের সামনে রবিন্দ্র জয়ন্তী করা । ১০২ জ্বরে সেটা এমনি ও সম্ভব হত না । এক ভাল যে পরের দিন থেকে গরমের ছুটি পড়ছে। সে বছর সারা ছুটির বেশীর ভাগটাই কেটেছিল জ্বর আর হামের ভোগান্তিতে ।
মা, তোমার মনে পড়ে, এই অসুখের সময়, একদিন তুমি মাথায় জলপটি দিতে দিতে শুনিয়েছিলে রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের
"বীরপুরুষ"
কবিতাটা । সেই প্রথমবার। জ্বরের ঘোর আর ওডিকোলোনের ঠান্ডা ছোয়ায় আমি যেন নিজেই বাসন্তী পাজ্ঞাবি আর সাদা চোস্তে বীরপুরুষ, তোমায় বলছি
"আমি আছি, ভয় কেন মা করো"
। পরে কিন্তু অনেক কেঁদে ছিলাম ভেবে যে মেয়ে হয় কি করে বীরপুরুষ হব, কি করেই বা মাকে রক্ষা করব? কিন্তু আশাকরি মেয়ে হয়েও এখন আমি তোমার বীরপুরুষ হতে পেরেছি ?
আজ ২৫শে বৈশাখ কবিগুরুর জন্মদিন, সকাল থেকে সেই প্রথম রবীন্দ্র জয়ন্তীর কথাই
মনে পড়ছে । আর মনে হচ্ছে তোমার কথা কারণ তুমি প্রথম আমাকে কবিকে চিনতে আর ভালবাসতে শিখিয়েছিলে আর এমন শিক্ষা ঠিক মত না পেলে কি যে হারাতাম সে আমিই জানি । বলতে ভুলে গেছি, এবারে তোমার দেওয়া বই "কবির বৌঠান" পড়ে কবি ও বাংলার সংস্কৃতির এই ফার্স্ট ফ্যামিলি সম্পর্কে আরো কত নতুন তথ্য জানছি । ভীষণ ভাল লাগছে ।
তুমি ভাল থেকো আর আমার প্রণাম জেন,
ইতি
No comments:
Post a Comment