Friday, 13 May 2016

২৫শে বৈশাখ



মা

আজ ৮ই মে আমাদের সাহেবি মতে Mother's Day অর্থাৎ মাতৃ দিবস হল্যান্ডে গত এক মাস ধরে চলছে দোকানে বাজারে মাতৃ দিবসের তোড়জোড় এমনকি গত সপ্তাহে আমাদের ব্যাঙ্গালোরে হাল আমলের এই উৎসবের আমেজ দেখে এলাম ভাবতে অবাক লাগছিল মাকে বা সন্তানদের ভালোবাসা জানাবার বা জিনিষ দেওয়ার জন্য বছরের একটি বিশেষ দিনের কি প্রয়োজন আমি তো তোমাকে বা আমন রাধারানীকে রোজই ফোন করি বরং আজই একটু কম কথা হলো তাড়া থাকার জন্য যাই হোক আজ একটা বিশেষ কারণে তোমাকে চিঠি লিখতে খুব ইচ্ছে হলো তাই লিখছি
জান মা, আজ সকালে ফেসবুক খুলে অবাক হয়ে গেলাম আমার বহু বাঙালি বন্ধুরা তাদের মা অথবা সন্তানদের মাতৃ দিবসের শুভকামনা জানিয়েছে কিন্তু বিশ্বকবির জন্মদিন মনে রাখেনি শতকরা নব্বই ভাগ লোক  আমাদের ছোটবেলায় ৮ই মের তাৎপর্য ছিল ২৫ শে বৈশাখ কবিগুরুর জন্মদিন যুগের হাওয়া আর পাশ্চাত্যের প্রভাবে দুঃখের বিষয় তা হারাতে নাহোক বিশেষ কমতে শুরু করেছে আমাদের ছোটবেলায় এইদিনটি শুরু হত রবিন্দ্র সংগিত দিয়ে আর তারপর রেডিও বা টিভিতে সারাদিন রবি ঠাকুরকে নিয়ে হত বিভিন্ন অনুষ্ঠান ছুটি না থাকলেও থাকত একটা উৎসবের আমেজ পরে বড়ো হয়ে অনেক রবিন্দ্র জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে নিজে অংশ নিয়েছি কিন্তু এখন এই সব সুন্দর উৎসব গুলো কোথায় যেন হারাতে বসেছে শুনেছি কলকাতায় আজকাল নাকি ভোট প্রচারেও রবিন্দ্র সংগীত বাজানো হয় !!!!

মা, তোমার মনে পড়ে আমার প্রথম রবিন্দ্র জয়ন্তী ? তখন বয়স প্রায় আট ছুঁই ছুঁই ক্লাস থ্রি তে পড়ছি ক্লাস টুয়ের বাচ্ছা নয় আর একেবারে ক্লাস থ্রি জুনিয়র স্কুল তাই বড় বড় ভাব আমাদের স্কুলের একটা দারুন গুন ছিল ইংরেজি মাধ্যম বা মিশনারি স্কুল হলেও বাংলা সংস্কৃতির চর্চা ছিল পুরদস্তুর আজ সেই শিক্ষার গুনেই বাংলা ভাষাকে এতো ভালবাসতে শিখেছি আর শিখেছি তোমার জন্য কবিগুরুকে ভালবাসতে

যাই হোক ফিরে যাই সেই প্রথম রবিন্দ্র জয়ন্তী অনুষ্ঠানে স্কুল ঠিক করল রবিন্দ্র জয়ন্তী হবে বেশ কয়েকটা নাচ গানের অনুষ্ঠান মিলিয়ে জুনিয়র সিনিয়র স্কুল একত্রে হয়ে বেশ একটা জমাটি ব্যপার দুদিন ধরে অনুষ্ঠান হবে যাতে জুনিয়র সিনিয়র স্কুলের সব ছাত্রীরা ঠিক করে অনুষ্ঠান দেখতে পারে আমাকে নেওয়া হয়েছিল জুনিয়র গ্রুপের একটি নাচে, রবি ঠাকুরের "আমরা সবাই রাজা" গানটার সাথে আমাদের পি টি টিচার নাচ শেখাবেন আর গান করবেন সিনিয়র স্কুলের কিছু ছাত্রী আর কয়েক জন টিচার রিহার্সাল শুরু হল কয়েকদিন পর থেকে নাচের স্কুলের বাইরে সেই প্রথম নাচ ভয় আর উত্তেজনা দুই ছিল মনের মধ্যে, কিন্তু নাচ শেখার আগ্রহ ছিল খুব কারণ জীবনে প্রথম রবিন্দ্র জয়ন্তী পালন করা হবে আসতে আসতে আয়ত্তে এলো নাচ আমাদের আমলে টিচারদের ধৈর্য ভালবাসা দুই ছিল অশেষ মুদ্রাগুলো আয়ত্ত করিয়েই ছাড়েন পি টি মিস্ পোশাক ঠিক হলো বাসন্তী রং এর পাজ্ঞাবি আর সাদা চুড়িদার ওই সময় চুড়িদার ব্যাপারটার চল হয়নি বিশেষ যেটা ছিল সেটা চুড়িদারের মত টাইট কিন্তু চুড়ি নেই চোস্ত পায়জামা বলা হত তাই সাদা চোস্ত ঠিক হল আর কোমরে বাটিকের স্কার্ফ মনে আছে তুমি শ্যামবাজারের পাজ্ঞাবি স্টোর্স থেকে কিনে দিয়েছিলে ছেলেদের পাজ্ঞাবি কিংবদন্তির নাম জানা হয়নি তখনো
সেই পোষাকে আমাদের বেশ মানিয়েছিল রবিন্দ্র জয়ন্তীর নাচে কিন্তু সবচেয়ে বড় উত্তেজনা মেক-আপ জীবনের দ্বিতীয় বার মেক-আপ এবং এবার সত্যি মেক-আপ দিয়ে তাই উত্তেজনার শেষ নেই অনেক রিহার্সাল দিয়ে শেষ পর্যন্ত সেই বহু অপেক্ষিত দিন হাজির জুনিয়র স্কুলের জন্য অনুষ্ঠান সকাল থেকে স্কুলে এসে স্কুলের পোষাক বদলে পাজ্ঞাবি চোস্ত পরা হয়েছে কয়েকজন টিচার মিলে মেক-আপ দিলেন সকলকে জীবনে প্রথম আসল মেক-আপের রূপ, রস, বর্ণে নিজেদের হুরি পরী সুন্দরী মনে হতে লাগল যেন ঠাকুরমার ঝুলি থেকে উঠে আসা সোনার কাঠি ছোয়ান রাজকন্যা একএকটি স্টেজের কোনায় রবি ঠাকুরের ছবি সাজানো তাতে রজনিগন্ধার মালা সব নাচের গ্রুপকেই ছবিতে প্রণাম করে তবে নাচ শুরু করতে হবে আমরা তাই করলাম দশটি অষ্ট বর্ষিয়া, চোখে ভয়মাখানো স্বপ্ন তারা সবাই রাজা না হলে রাজকন্যা তো বটেই, নিজেদের কাছে, মা বাবারদের কাছেও

আমাদের নাচ শেষ এবার অন্যদের বাকি অনুষ্ঠান দেখার পালা তার চেয়ে বড় কথা কাল সিনিয়র স্কুলের বড়মেয়েরা আর সিনিয়র টিচাররা আমাদের নাচ দেখবেন উত্তেজনার চুড়ান্ত মনে আছে বাড়ি ফিরে তোমাকে, দিদুকে, বাবাই কে সব গল্প করতেই কেটে গেল বাকি দিনটা রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়া কারণ পরের দিন আরো বড় অনুষ্ঠান নাচের স্বপ্নে রাত কাবার কখন যে ভোর হয়ে গিয়েছিল তা বুঝতেই পারিনি মনে আছে তোমার ডাকে ঘুম ভাঙে তোমার ঠান্ডা হাতের স্পর্শ কপালে, আর তারপর একটা হই চই মনে আছে আমার অনেক অনুনয় সত্তে স্কুল যেতে দেওয়া হল না আমাকে হল না সিনিয়র স্কুলের সামনে রবিন্দ্র জয়ন্তী করা ১০২ জ্বরে সেটা এমনি সম্ভব হত না এক ভাল যে পরের দিন থেকে গরমের ছুটি পড়ছে সে বছর সারা ছুটির বেশীর ভাগটাই কেটেছিল জ্বর আর হামের ভোগান্তিতে

মা, তোমার মনে পড়ে, এই অসুখের সময়, একদিন তুমি মাথায় জলপটি দিতে দিতে শুনিয়েছিলে রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের "বীরপুরুষ" কবিতাটা সেই প্রথমবার জ্বরের ঘোর আর ওডিকোলোনের ঠান্ডা ছোয়ায় আমি যেন নিজেই বাসন্তী পাজ্ঞাবি আর সাদা চোস্তে বীরপুরুষ, তোমায় বলছি "আমি আছি, ভয় কেন মা করো" পরে কিন্তু অনেক কেঁদে ছিলাম ভেবে যে মেয়ে হয় কি করে বীরপুরুষ হব, কি করেই বা মাকে রক্ষা করব? কিন্তু আশাকরি মেয়ে হয়েও এখন আমি তোমার বীরপুরুষ হতে পেরেছি ?


আজ ২৫শে বৈশাখ কবিগুরুর জন্মদিন, সকাল থেকে সেই প্রথম রবীন্দ্র জয়ন্তীর কথাই মনে পড়ছে আর মনে হচ্ছে  তোমার কথা কারণ তুমি প্রথম আমাকে কবিকে চিনতে আর ভালবাসতে শিখিয়েছিলে আর এমন শিক্ষা ঠিক মত না পেলে কি যে হারাতাম সে আমিই জানি বলতে ভুলে গেছি, এবারে তোমার দেওয়া বই "কবির বৌঠান" পড়ে কবি বাংলার সংস্কৃতির এই ফার্স্ট ফ্যামিলি সম্পর্কে আরো কত নতুন তথ্য জানছি ভীষণ ভাল লাগছে

তুমি ভাল থেকো আর আমার প্রণাম জেন,

ইতি






No comments:

Post a Comment